পশুর নদী বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খুলনা ও বাগেরহাট জেলার একটি নদী। নদীটির দৈর্ঘ্য ১৪২ কিলোমিটার, প্রস্থ ৪৬০ মিটার থেকে ২.৫ কিলোমিটার এবং নদীটির প্রকৃতি সর্পিলাকার। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড বা "পাউবো" কর্তৃক পশুর নদীর প্রদত্ত পরিচিতি নম্বর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদী নং ৫১।
পশুর নদীটি খুলনা জেলার বটিয়াঘাটা উপজেলার আমিরপুর ইউনিয়নে প্রবহমান ভৈরব নদী হতে উৎপত্তি লাভ করেছে। অতঃপর এই নদীর জলধারা একই জেলার দাকোপ উপজেলার খুলনা রেঞ্জ ইউনিয়ন পর্যন্ত প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে নিপতিত হয়েছে। নদীতে সারাবছর পানিপ্রবাহ থাকে এবং ছোটবড় নৌযান চলাচল করে। নদীটির উজানের তুলনায় ভাটির দিক অধিক প্রশস্ত।
পশুর নদী সুন্দরবনের এক অতি বৃহৎ নদী, প্রকৃতপক্ষে রূপসা নদীরই বর্ধিত রূপ। খুলনার দক্ষিণে ভৈরব বা রূপসা নদী আরও দক্ষিণে মংলা বন্দরের কাছে পশুর নামে প্রবাহিত হয়ে ত্রিকোনা ও দুবলা দ্বীপ দুটির ডানদিক দিয়ে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে। মংলার দক্ষিণে পশুর সুন্দরবনের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গড়াই নদীর অধিকাংশ পানি নবগঙ্গার মাধ্যমে এই নদী দিয়ে প্রবাহিত হয়। বদ্বীপ অঞ্চলে আকারের দিক দিয়ে মেঘনার পর পশুরের স্থান। পশুর নদী চালনা থেকে প্রায় ৩২ কিমি দক্ষিণে মংলা খালের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। তারপর প্রায় দক্ষিণাভিমুখী প্রবাহিত হয়ে মোহনার ৩২ কিমি উত্তরে শিবসার সঙ্গে মিলিত হয়েছে।
এই
নদীটি সুন্দরবন লাগোয়া নয়নাভিরাম সমুদ্র সৈকতে পণ্যবাহী জাহাজ, সুন্দরবন ভ্রমণের
লঞ্চ, প্রাইভেট নৌযান কিংবা অন্য যেকোনো নৌযানে করে ভ্রমণের জন্য একটি অন্যতম ট্রানজিট
হিসাবে ব্যবহার করে এই পশুর নদীটি।
প্রতিদিন
সকাল থেকে শুরুকরে সন্ধা পর্যন্ত জীবিকার তাগিদে এই নদী বির্ভরশীল মানুষগুলোর অবিরাম
ছুটে চলা । কেউ বা টিুরিষ্টদের বহন করেন কেউ বা মৎস শিকার করেন, আবার অনেকেই মালামাল
বহন করেন, কেউ বা খেয়া পারাপার করেন এপার থেকে ওপারে। এভাবেই কেটে যাচ্ছে নদী নির্ভরশীল
মানুষগুলে ব্যস্ততম জীবণ ও জীবিকা………
পশুর নদীর ইতিহাস ও গুরুত্ব:
পশুর নদী সুন্দরবনের একটি প্রধান নদী, যা সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই নদীটি মংলা সমুদ্র বন্দরের মাধ্যমে বাংলাদেশের সামুদ্রিক বাণিজ্যে প্রধান ভূমিকা রাখে।
পশুর নদী সুন্দরবনের ভেতরের লবণাক্ত পানির প্রধান যোগানদাতা।
সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় নদীটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এটি সুন্দরবনের ভেতরের প্রধান প্রধান নদীগুলোর মধ্যে অন্যতম।
এই নদীটি সুন্দরবনের মানুষের জীবন ও জীবিকার প্রধান উৎস।
বাংলাদেশখুলনা বিভাগের বাগেরহাট জেলার দক্ষিণ-পশ্চিমে
অবস্থিত একটি প্রাচীন মসজিদ। এই মসজিদের সৃষ্টি নিয়ে যেমন, বিতর্ক রয়েছে তেমনি বিতর্ক
রয়েছে, এই মসজিদের নামকরণ নিয়েও। মসজিদটির
গায়ে কোনো শিলালিপি নেই। তাই এই মসজিদটি কোন
সময়ে নির্মিত হয়েছে, কে নির্মাণ করেছে, কিভাবে নামকরণ করা হয়েছে। এছাড়াও এই মসজিদটির
মোট গম্বুজের সংখ্যা কতটি রয়েছে। এসকল বিষয়ে নানা বিতর্কের উত্তর দিব আমাদের আজকের
আয়োজনে।
চলুন প্রথমেই জেনে নেওয়া যাক
এই মসজিদটির পরিদর্শনের বিস্তারিত------
এই মসজিদটি পরিদর্শন করতে চাইলে
বাংলাদেশের যে কোন প্রান্ত থেকে খুলনা বিভাগের বাগেরহাট জেলা সদর বাস ষ্টান্ডে আসতে
হবে। সেখান থেকে সি এস জি অথবা অটোরিকশা করে চলে আসতে পারেন ষাট গম্বুজ মসজিদ প্রাঙ্গনে।
এখান থেকে প্রবেশ টিকিট সংগ্রহ করে এই মসজিদ টি পরিদর্শন করতে হবে । এখানে বিদেশী পর্যটকদের
জন্য টিকিট মূল্য ৫০০ টাকা, সার্কভূক্ত দেশগুলোর পর্যটকদের জন্য প্রবেশ মূল্য ২০০ টাকা
এবং বাংলাদেশী নাগরীদের জন্য প্রবেশ মূল্য ৩০ টাকা। এছাড়া মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক
ছাত্র ছাত্রীদের জন্য প্রবেশ মূল্য ১০ টাকা।
টিকেট সংগ্রহ করে ভিতরে প্রবেশ
করলেই হাতের ডানপাশে পেয়ে যাবেন বাগরেহাট যাদুঘর। যেখানে রয়েছে সারাদেশের ঐতিজ্যবাহী
মসজিদ, পুরাতাত্ত্বিক স্থাপত্যের ছবি, খান জাহান আলীর মাজারের ঐতিহাসিক কুমিরের মমি
এবং প্রাচীন আমলের উল্লেখযোগ্য নিদর্শন বিভিন্ন স্মৃতি চিহৃ,মূদ্রা, বাসন, তৈজসপত্র,মানচিত্র
এবং লিপিবদ্ধ ইতিহাস। এছাড়াও ৬০ গম্বুজ মসজিদের অবকাঠামো প্রদর্শন করা হয়েছে। যা দেখলে প্রাচীন ইতিহাসের নিদর্শনগুলি উপলদ্ধি
করতে পারবেন।
চলুন এই মসজিদটি নির্মান সম্পর্কে
কিছু তথ্য জেনে আসি।
অনেকগুলো অনলাইন পোর্টালে এই
মসজিদ নির্মান সম্পর্কে কিছু তথ্য দেওয়া আছে। যেখানে লেখা আছে, ধারণা করা হয় এই ,মসজিদটি
১৫শ খ্রিস্টাব্দে নির্মাণ করা হয়েছে এবং এই মসজিদটি নির্মানি করেছেন হযরত খান জাহান
আলী।
হযরত খান জাহান আলী জন্মগ্রহণ
করেন 1369 খ্রিস্টাব্দে এবং মৃত্যুবরণ করেছেণ ১৪৫৯ খ্রিস্টাব্দে। তাহলে কিভাবে সম্ভব
১৫শত খ্রিস্টাব্দে মসজিদটি নির্মান করা। তবে ধারণা করা হয় এই মসজিদটি হযরত খান জাহান
আলীর শ্বাসন আমলেই নির্মান করা হয়েছে।
এই মসজিদটি বহু বছর ধরে ও বহু
অর্থ খরচ করে নির্মাণ করা হয়েছিল। পাথরগুলো আনা হয়েছিল রাজমহল থেকে। বাংলাদেশের
তিনটি বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের মধ্যে
১টি হলো বেগেরহাট জেলায় অবস্থিত 60 গম্বুজ মসজিদ। যার ফলে বাগেরহাট শহরটিকেই বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের মর্যাদা
দেওয়া হয়েছে। ১৯৮৫ খ্রিষ্টাব্দে ইউনেস্কো এই সম্মান
প্রদান করে।
এই মসজিদের নামকরণ নিয়েও
রেয়েছে নানা বিতর্ক, এসকল বিষয়ে বিস্তারিত জেনে আসি।
ঐতিহাসিকরা মনে করেন, সাতটি সারিবদ্ধ
গম্বুজ সারি আছে বলেই এ মসজিদের সাত গম্বুজ নাম থেকে ষাটগম্বুজ নামটির উৎপত্তি হয়েছে।
আবার অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন, গম্বুজগুলো ৬০ টি স্তম্ভের ওপর অবস্থিত বলেই নাম ষাটগম্বুজ
হয়েছে। আবার কেউ বলেন এই মসজিদটির ছাদ গম্বুজ আকৃতির হওয়ায়, ছাদ গম্বুজ নাম থেকে ৬০ গম্বুজ নামকরণ করা হয়।
মসজিদটির নাম ষাট গম্বুজ (৬০
গম্বুজ) মসজিদ হলেও এখানে গম্বুজ মোটেও ৬০টি নয়,বরং গম্বুজ সংখ্যা ৮১টি। ১১টি সারিতে
৭টি করে মোট ৭৭টি গম্বুজ রয়েছে এছাড়াও ৪পাশে
৪টি মিনারের উপরে রয়েছে আরও ৪টি গম্বুজ সর্বমোট ৮১ টি গম্বুজ। পূর্ব দেয়ালের মাঝের
দরজা উপরের সারিতে যে সাতটি গম্বুজ সেগুলো দেখতে অনেকটা বাংলাদেশের চৌচালা ঘরের চালের
মতো।
বহির্ভাগ
মসজিদটি উত্তর-দক্ষিণে বাইরের
দিকে প্রায় ১৬০ ফুট ও ভিতরের দিকে প্রায় ১৪৩ ফুট লম্বা এবং পূর্ব-পশ্চিমে বাইরের
দিকে প্রায় ১০৪ ফুট ও ভিতরের দিকে প্রায় ৮৮ ফুট চওড়া। মসজিদটির পূর্ব দেয়ালে ১১টি
বিরাট আকারের খিলানযুক্ত দরজা আছে।
মাঝের দরজাটি অন্যগুলোর চেয়ে বড়। উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালে আছে ৭টি করে দরজা। মসজিদের
৪ কোণে ৪টি মিনার আছে।
মিনারগুলোর উচ্চতা, ছাদের কার্নিশের
চেয়ে বেশি। সামনের দুটি মিনারে প্যাঁচানো সিড়ি আছে এবং এখান
থেকে আযান দেবার ব্যবস্থা
ছিল। এদের একটির নাম রওশন কোঠা, অপরটির নাম আন্ধার কোঠা। মসজিদের
অবকাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ায় এগুলো বন্ধ রাখা হয়েছে।
মসজিদের ভেতরে ৬০টি স্তম্ভ বা পিলার আছে। এগুলো উত্তর
থেকে দক্ষিণে ৬ সারিতে অবস্থিত এবং প্রত্যেক সারিতে ১০টি করে স্তম্ভ আছে। প্রতিটি স্তম্ভই
পাথর কেটে বানানো, শুধু ৫টি স্তম্ভ বাইরে থেকে ইট দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে।
মসজিটির পশ্চিম পাশে রয়েছে
বিশাল আকৃতির একটি দিঘী। যার নাম ঘোড়া দিঘী। ধারনা করা হয় হযরত খান জাহান আলী বাংলায়
পদার্পণের পর সাধারণ মানুষের পানির অভাব দূর করার উদ্দেশ্যে ৩৬০ দিঘী খনন করেছিলেন।
যার ১ম দিঘীটি এই ৬০ গম্বুজ প্রাঙ্গণে খননকৃত ঘোড়া দিঘী।
তো বন্ধুরা এই ছিলো আমাদের
আজকের আয়োজনে। পরবর্তীতে অন্য কোন দর্শনীয় স্থানের সৌন্দর্য্য তুলে ধরবো আপনাদের মাঝে
ভালো থাকবেন সুস্থ থাকবেন আল্লাহ হাফেজ।